রাগ নিয়ন্ত্রণ করার নতুন কৌশল।

 রাগকে নিয়ন্ত্রন করার কার্যকরী উপায়।


রাগ কি? 

কি কি কারনের জন্য আমরা রেগে যাই?

রাগ এর ফল কি হতে পারে?


রাগ কি?

রাগ হল মনের আবেগের একটি অংশ। 

যেমন, হাসি,কান্না, দুঃখ, রাগ, অভিমান ইত্যাদি। রাগ প্রতিটি মানুষের জীবনেই চলার পথে কোন না কোন সময় হয়ে থাকে। 


আমাদের আচরণ গতদিক দিয়ে এটি যখন বাইরে প্রকাশ পায় তখন সেটিকে রাগ বলে থাকি। এর মাধ্যমে আমাদের শরীরে এবং মনে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। 


যেমন, প্রচন্ড রাগে হাত পা কাঁপতে থাকে, মুখমন্ডল লাল হয়ে যায়, অনেকের আবার খুব জোর জোর নিঃশ্বাস পড়তে থাকে। অনেকে ভাঙ্গচুর করে থাকে ইত্যাদি।


আমরা কি কি কারণে রেগে যাই?


রেগে যাওয়ার অনেক গুলো কারণ আছে। যে সকল কারণের জন্য আমরা রেগে যাই। সেই সব বিষয় গুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

যেমন..........

(১) পছন্দের জিনিস না হলে:

আমাদের প্রছন্দ মতো কিছু না হলে, অথবা না করলে আমরা অনেক সময় রেগে যাই। অথবা আমি যেটা চাই সেটা যদি না পাই তাহলেও রেগে যাই আমরা।


(২) কথা দিয়ে কথা না রাখা:

কেউ হয়তো আপনার একটি কাজ করে দিবে বলেছে। কিন্তু তার আর কোন পাত্তা নেই। এ ক্ষেত্রে আপনার রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক। কিংবা আপনাদের দেখা করার জন্য কোন এক জায়গার কথা হয়েছিল কিন্তু সে কোন কারনে আপনার সাথে দেখা করতে পারলো না ইত্যাদি।


(৩) তর্ক বিতর্কের সৃষ্টির মাধ্যমে রেগে যাওয়া:

একটা সামান্য বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলতে সেটা একসময় তর্কের রূপ ধারণ করে এবং পরে সেটা কথা কাটাকাটি তার পর ঝগড়ার সৃষ্টি হয়। 


(৪) মিথ্যা কথা কেউ বললে রাগ হয়: 

অনেকেই আছে মিথ্যা কথা বলা একদম পছন্দ করে না। মিথ্যা কথা শুনলেই রেগে যায়। তার মধ্যে আমিও একজন, আমিও মিথ্যে কথা বলা সহ্য করতে পারি না। তোমার যত কষ্ট ই হোক তবুও সত্যি কথা বলো কিংবা যত খারাপ খবর হোক না কেন তবুও আমি সত্যি টা শুনতে ভালোবাসি।


(৫) একই জিনিস বার বার বললে: 

একটা কথাই যদি বার বার কেউ বলতে থাকে তাহলে রাগ হয়। আরও যদি সেই কথাটি মিথ্যা কথা হয় তাহলে তো আর কথাই নেই।


(৬) বিশ্বাস ভঙ্গ করা: 

আপনি কারোর প্রতি খুব আস্তা রাখেন আর সেই ব্যক্তি যদি আপনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাহলে আপনার রাগ অবশ্যই হবে।


(৭) কারো কাছে অপমানিত হওয়া:

যদি আপনি কোন কারনে কারো কাছে অপমানিত হন তাহলে আপনার রাগ হবেই। হয়তো প্রকাশ করবেন না সেই মুহূর্তে কিন্তু রাগটি তার উপর থেকে যাবে। এটা একটা কমন জিনিস অপমানিত বোধ সবার মধ্যেই আছে। কারো কম কারো ক্ষেত্রে একটু বেশি।


(৮) প্রিয় জিনিস নষ্ট হয়ে যাওয়া: 

যদি আপনি একটি গোলাপ গাছ লাগন এবং তার পরিচর্যা করেন প্রতিদিন, হঠাৎ একদিন সকালে দেখলেন গাছটি নষ্ট হয়ে গেছে। তাহলে আপনার রাগ দুঃখ দুটোই হবে। 

কারণ, যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গোলাপ গাছটি নষ্ট হয়ে থাকে তাহলে আপনি খুব দুঃখ পাবেন। আর যদি কেউ ইচ্ছা করে নষ্ট করে থাকে তাহলে আপনি তার প্রতি ভীষন রেগে যাবেন।


(৯) কথার অবাধ্য হওয়া: 

আপনার পরিবারের অথবা পরিচিত দের মধ্যে সাধারণত এই কথার অবাধ্য হওয়া বেশি লক্ষ্য করা যায়। আর তাদের মধ্যেও এই রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক।

অনেক বারণ করা সত্তেও যখন সে ওটাও করে তখন তার প্রতি আমাদের রাগ হয়।


(১০) অন্যায় কাজে প্রতিবাদ করা: 

অন্যায় কাজে কাউকে বাধা দিলে আপনার প্রতি তার রাগ হবে। এবং আপনি বাধা দেওয়ার পরেও যদি সে কাজটি আবার করে তাহলে আপনার রাগ হবে তার প্রতি।

এছাড়াও আরো অনেক কারণ রয়েছে আমাদের রাগের পেছনে। আমি সব গুলো লিখলাম না। 


রাগ এর ফলাফল কি হতে পারে?

রাগ এর ফল যে কি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে তার কল্পনাও করা সম্ভব নয়।

রাগের মাথায় মানুষ নিজেকে পর্যন্ত সারা জীবনের জন্য শেষ করে দিতে পারে। এবং তার সাথে তার পরিবার কেউ শেষ করে দিতে পারে। এমন ঘটনা মাঝে মধ্যে দেখা যায় যে, পরিবারের বৌ ছেলে মা বাবাকে মেরে শেষ পর্যন্ত নিজে আত্মঘাতী হয়েছে। 

রাগের সময় সেই ব্যক্তির কোন ভালো জ্ঞান থাকে না। সে কি করতে যাচ্ছে বা ভালো না মন্দ সে ধারণা তার মাথায় থাকে না। 

কিন্তু পরে, সবকিছু ঘটনা ঘটার পর তার মনে হয় যে কি ভুল টাই না আমি করেছি। 

অতিরিক্ত রেগে যাওয়া ব্যক্তি আর একটি পাগল ব্যক্তির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। বরং পাগল ব্যক্তি খারাপ কিছু নাও করতে পারে কিন্তু রেগে যাওয়া ব্যক্তি কি করবে বলা মুশকিল।

আমরা বাবা মায়ের সাথে ঝগড়া লেগে অনেক সময় বাড়ির জিনিসপত্র ভাঙ্গচুর করি। অথবা নিজের ফোন টাকে পর্যন্ত আছাড় মেরে ফেলে দি। তাতে লাভ টা কার হয় অথবা ক্ষতি কার হয় সেটা তখন বুঝি না। পরে রাগ কমে গেলে বুঝতে পারি ক্ষতি আমার হয়েছে। 

যাইহোক এরকম রাগের মাথায় অনেক ঘটনা ঘটে......


এবার জানবো রাগ নিয়ন্ত্রণ করব কিভাবে?


রাগকে পুরোপুরি ভাবে শরীর ও মন থেকে মুছে ফেলতে পারবেন না একেবারেই.........

কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রন করতে পারবেন কয়েকটি কৌশল এর মাধ্যমে। কিন্তু তার জন্য আপনাকে প্রচুর ধৈর্য্যের সাথে অনুশীলন করতে হবে এবং কিছু কথা সবসময় মাথায় রাখতে হবে। যেমন........


(১) মেডিটেশন করুন নিয়মিত করে:

যারা অল্পতেই রেগে যায়, তারা ভোরে উঠে ৩০ মিনিট মেডিটেশন করুন। প্রথমে শান্ত হয়ে বসে চোখ বন্ধ করে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়তে থাকুন। শুধু মাত্র নিঃশ্বাস এর উপর মনোযোগ দিন। অন্য কিছু মাথায় আসলেও মনোযোগ রাখুন নিঃশ্বাসের উপর।

প্রথমে খুব অসুবিধা হবে, চার পাঁচ দিন নিয়মিত করার পর আর অসুবিধা হবে না।



(২) বাচ্চাদের সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটান: 

এখানে শুধু মাত্র পরিবারের বাচ্চাদের কথা বলছি না। পারলে অন্য বাচ্চাদের সাথেও মিশুন। তাদের সাথে জমিয়ে আড্ডা দিন। যাহাতে সেই বাচ্চাগুলো ভাবে আপনি তাদের একজন ভালো বন্ধু।


(৩) একটি রেগে যাওয়ার ঘটনা মনে করুন:

আপনি আগে সবচেয়ে বেশি কোন ঘটনার জন্য রেগে ছিলেন? কি কারণে রেগে গিয়ে ছিলেন? আর তার পর কি ভাবে নিজেকে শান্ত করলেন? কিংবা আপনি সেই মুহূর্তে শান্ত না হয়ে যদি কিছু করে ফেলতেন তাহলে আপনার কি ক্ষতি হতো অথবা আপনি যার জন্য রেগে গিয়ে ছিলেন তার কি ক্ষতি হতে পারতো? 

এই সব প্রশ্নগুলো নিজেকে করুন রাতে শোবার সময়।



(৪) আপনার রেগে যাওয়া স্থান, দৃশ্য, এবং কথা এগুলো থেকে দূরে থাকুন: 

আমারা অনেকেই জানি না কেন আমরা রেগে যাই। এই রেগে যাওয়ার কারণ টি খুঁজে বের করতে হবে আপনাকে।

আপনি যদি কথা কাটাকাটি বা তর্কবিতর্কের মধ্যে পড়ে রেগে যান তাহলে তর্ক থেকে দূরে থাকুন।

আপনি যদি কোন জায়গায় ভুল করে চলে যান। মানে যে জায়গায় গেলে আপনার অস্বস্তি বোধ হয় সে স্থানে যাবেন না।

আপনি যে সকল দৃশ্য দেখতে পছন্দ করেন না সেই সব জিনিস দেখতে যাবেন না। 

মোটকথা আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে। আপনি কোন কোন বিষয়ের উপর রেগে যান। সেগুলোর থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুন।


(৫) প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করবেন না:

"প্রতিশোধ" এই শব্দটি খুবই বিপদজনক। তাই এই শব্দটি ব্যবহার করবেন না আপনার জীবনে। তাতে করে রাগ আর হিংসা বেড়েই যাবে আর শেষ পর্যন্ত তার ফল কি হবে বোঝা খুব মুশকিল। তার পরিবর্তে হয়তো কারো বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে কিংবা নিজের ক্ষতি হবে।


(৬) মনের মধ্যে রাগ পুষে রাখা: 

মনের মধ্যে রাগ পুষে রাখা একটা বিরাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার লক্ষণ। 

যারা রাগটাকে সাথে সাথে প্রকাশ করে দেয় তাদের মধ্যে অপকর্ম করার সম্ভাবনা কম থাকে। 

কিন্তু যারা রাগটাকে নিজের মনে পুষে রেখে দেয়। তাদের অপকর্ম করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। আর এরা যে কখন কি করবে বলা খুব মুশকিল।


(৭) যে মুহূর্তে রেগে গেছেন, সেই মুহূর্তে যে কেউ যদি আপনাকে শান্ত হতে বলে বা বোঝায় তাহলে তার কথা শুনুন। 

কারণ, সেই মুহূর্তে আপনার কোন জ্ঞান থাকে না। আপনি প্রায় উদ্মাদের মতো আচরণ করতে থাকেন।

 অতিরিক্ত রেগে যাওয়া ব্যক্তি আর উদ্মাদ ব্যক্তির মধ্যে বেশি পার্থক্য থাকে না। তাই তখন আপনি কি করবেন বলা যায় না। 

তাই দু পাঁচ সেকেন্ডের জন্য হলেও তার কথা শুনুন। কারণ সে রেগে নেই তার মাথা ঠিক আছে, তার মাথা গরম নেই আপনার মতো। একমাত্র সেই আপনাকে এই মুহূর্তে কন্ট্রোল করতে পারবে। তাই তার কথা শুনুন। 


এটাই হলো আপনার রাগকে কন্ট্রোল করার প্রথম উপায়।


(৮) জায়গা পরিবর্তন করা:

আপনি যেখানে রেগে আছেন বা যার জন্য রাগের উৎপত্তি সেখান থেকে আপনার পছন্দের জায়গায় দ্রত চলে আসুন। সেই রাগের জায়গাটি ত্যাগ করে।


(৯) চোখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করুন: 

চোখ বন্ধ রেখে নিঃশ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা করুন। নিঃশ্বাস যেন খুব দ্রুত না পড়ে সেই দিকে খেয়াল রাখুন।


(১০) ১০০ থেকে ১ পর্যন্ত গুনতে থাকুন। চোখ বন্ধ রেখে।

এছাড়াও চৌকোলেট রাখতে পারেন সাথে । রাগ হলে একটি চৌকোলেট মুখে পুরে চুষতে থাকুন। কিন্তু চিবিয়ে খাবেন না। এটা মাথায় রাখবেন ........


এছাড়াও কয়েকটি ব্যায়ম করতে পারেন এতে মন আর শরীরের পক্ষে খুবই উপকার হবে। 
উপরের এই সব বিষয় গুলো ভালো করে অনুসরণ করলে আমার মনে হয়, আপনার রাগ অনেক খানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।
তবে অবশ্যই এগুলো নিয়মিত করতে হবে আপনাকে......






 








Post a Comment

Previous Post Next Post